অন্যান্য সাহিত্য

জীবনের যতিচিহ্নগুলো-১২


[পর্ব-১২: প্রাইমারি স্কুলপর্ব]
দেখতে দেখতে পুরনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-অতিথির মতো এসে হাজির হলো শীতকাল। আমাকে আবার স্কুলে ভর্তি হতে হবে। সেই যে দুই বছর আগে ক্লাস থ্রির বার্ষিক পরীক্ষার সময় হঠাৎই হাফেজি পড়া শুরু করলাম, আর তো স্কুলমুখো হইনি। এবার নানি শীতের ঠকঠকে সকালে গরম পানি করে আমাকে গোসল করালেন। সারা পিঠে ঝামার (শুকনো ঝিঙা বা ধুন্দুলের ভেতরে অংশ) সঙ্গে ৫৭০ তিব্বত সাবান লাগিয়ে দীর্ঘসময় ধরে ঘষলেন। এরপর সারাগায়ে মেখে দিলেন সরিষার তেল। আর মাথায় দিলেন ত্রিফলার তেল। তেলের ঘ্রাণে নাসারন্ধ্রে কেমন সুড়সুড়ি লাগছিল। কিন্তু কিছুই বলতে পারলাম না। সাজগোজ শেষ হলে বাবা ও ছোট খালা সঙ্গে বের হলাম। স্কুলে এসে হেড স্যার মানে মৌলবি ইলিয়াস স্যারের রুমে ঢুকতে আমার বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শুরু হলো।

হেডস্যার আমার মাথায় হাত বোলাতে গিয়েও থেমে গেলেন। বাবাকে বললেন, ‘বাচ্চার মাথায় এত তেল দিয়েছেন কেন? একেবারে তেল দিয়ে গোসল করিয়ে দিলেন।’ এরপর নামধাম জিজ্ঞাসা করলেন। আগে কোন ক্লাস পর্যন্ত পড়েছিলাম, তাও জেনে নিলেন। লম্বা লাল কাভারের একটি খাতা বের করলেন। সেখানে নামধাম লিখলেন। বললেন, ‘আরও দুই-একদিন আসা-যাওয়া করতে থাকো। নতুন বই আসবে। দুই একদিনের মধ্যে। তখন বই পাবে। খাতাও।’ তবে, হেড স্যার সেদিন খালি হাতে ফেরালেন না। একটি ‘আমার বাংলা চতুর্থ ভাগ’ দিলেন। আর দিলেন একটি স্লেট।

স্কুল ছুটি হলো। সবাই হুড়মুড় করে বের হচ্ছে। আমি ভিড়ের ভেতর দরোজা দিয়ে বের হতে পারছিলাম না। কী করি, কী করি—চারদিকে তাকাতে লাগলাম। জানালা দিয়ে দেখি ছোটখালা দাঁড়িয়ে। তিনি ক্লাস ফাইভে পড়েন। বললেন, জানালা দিয়ে লাফ দে। কথামতোই লাফ দিলাম। পড়িমরি করতে করতে তার পায়ের ওপরই হুমড়ি খেলাম। খালা টেনে তুললেন। বললেন, ‘চল। আগে দাদার দোকানে যামু। দুই জনে দুই কাপ মিকচার খামু। বেলা বিস্কুট দিয়ে। এরপর বাড়িত যামু।’ তার দাদা মানে আমার বাবা।

ততদিনে অন্যান্য চা দোকানে কালো বা নীল রঙের গাভির ছবিযুক্ত ‘ব্লু ক্রস’ কনডেন্সড মিল্কের চা বিক্রি শুরু হয়ে গেছে। গরুর দুধের চায়ের চেয়ে কনডেন্সড মিল্কের চা মিষ্টি-ঘন বেশি।

আমার মায়েরা চার বোন, এক ভাই।। তিন বোনের পর এক ভাই। এরপর একবোন। বড় তিন বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। আমার মা মেজ। অথচ আমরা সেজ জনকে মেজ খালা ডাকি। বড় খালাকে বড় খালা। ছোট খালাকে তো কখনো খালা, কখনো নাম ধরেই ডাকি। মেজ খালা, ছোট কালা ও মামা; তিনজনেই আমার বাবাকে দাদা ডাকেন। তারা কখনোই ভাইছাব বা দুলা ভাই ডাকতেন না।

ছোট খালার সঙ্গে আমাদের দোকানে এলাম। দোকানে মানে ছোট্ট চা দোকান। ছয়-সাত জন মানুষ বসতে পারে। আমাদের সেই আলিশান মুদি দোকান আর নেই। আর্থিক অবস্থা এতই খারাপ যে, আমরা কেবল দুপুরে ভাত খাই। রাতে  আটার সঙ্গে চিংড়ি মাছ দিয়ে এক ধরনের খাবার তৈরি করতেন মা। সেটা খেতাম। ঝাল ঝাল হতো খুব। সকালে কখনো মরিচ বাটা, কখনো চিংড়ি শুটকির ভর্তা দিয়ে আটার রুটি। তবে, মাছ আমাদের কিনতে হতো না। পুকুরে ছিল। বাড়ির পাশে খাল থেকেও প্রচুর ধরে আনতাম। নানা জাতের মাছ। শোল-টাকি। কোরাল। বাটা। ট্যাংরা। বেলে। সবচেয়ে বেশি পাওয়া যেতো চিংড়ি আর পুঁটি। যদিও পুঁটি কেউ খেতে চাইতো না। নিতান্ত নিরুপায় হলে খেতে বাধ্য হতো।

সে যাই হোক। বাবার অর্থনৈতিক অবস্থা এতই খারাপ যে চা দোকানেও তেমন কিছু রাখতে পারতেন না। হয়তো দুই-তিন প্যাকেট বেলা বিস্কুট, দশ খানা লোপ। আর বেচতেন বাড়ি থেকে তৈরি করে আনা আটার রুটি, সঙ্গে আলু ভাজি। কেউ কেউ চা দিয়েই খেতেন। চা থাকতো দুই ধরনের। প্রথমত গরুর দুধের চা, দ্বিতীয়ত আদা-তেজপাতা-দারুচিনি নিয়ে জ্বাল দেওয়া রঙ চা। দুধ চা আট আনা, রঙ চা চার আনা। ততদিনে অন্যান্য চা দোকানে কালো বা নীল রঙের গাভির ছবিযুক্ত ‘ব্লু ক্রস’ কনডেন্সড মিল্কের চা বিক্রি শুরু হয়ে গেছে। গরুর দুধের চায়ের চেয়ে কনডেন্সড মিল্কের চা মিষ্টি-ঘন বেশি। বেশিরভাগ মানুষই কনডেন্সড মিল্কের চা পছন্দ করতো। বাবার দোকানে গরুর দুধের চা খেতে চাইতো না। অন্যে গ্রাহককেই দেখেছি বাবাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে চলে যেতো। বলতো, ‘ধুর ভাইছাব, অন কি আর হেয় দিন আছে? গরুর দুধের চা কেউ খায়নি? পটের দুধ আর কয় টাকা?’

শুনে বাবা রাগে গজগজ করতেন। কিন্তু কিছু বলতেন না। একদিন গেলেন হাদি সদাগরের মুদি দোকানে। উদ্দেশ্য কন্ডেন্সড মিল্ক আনবেন। বাবার কথা শুনে হাদি সদাগর বললেন, ‘ভাইছাব হুনেন। এই দুধে আন্নে পোষাইতে পাইরতেন ন। একটা পট সাত টাকা। আন্নেরলায় না হয় সাড়ে ছয় টাকা পর্যন্ত রাইখমু। কিন্তুক ভাবি দেখেন—একপটে চা অইবো অল্প কয় কাপ। পরে কিন্তুক লাটে উঠবো আন্নের দোকানদারি।’

বাবা বড় আশা করে গেছিলেন। সঙ্গে আমিও ছিলাম। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দরকার নাই। গরুর দুধই ভালা। মাইনষে খাইলে খাইলো, না খাইলে নাই। চল দোকানে যাই।’ দোকানে বসে চুলা জ্বালাতে জ্বালাতে নিজের নসিবকে কত লক্ষ বার যে দুষলেন, তার ইয়ত্তা নেই।

স্লেট বাতাসে টাল খেতে খেতে রাস্তা থেকে ধানক্ষেতে পড়ে। ধানক্ষেতে তখন খেসারির ডালের নতুন চারা। আর নাড়ায় একাকার।

খালা যখন বললেন, চল দাদার দোকানে যামু, তখন আমার ভালো লাগলো না। কারণ আমার ছোট্ট বেলায় মাত্র তিনটি দোকান দিয়ে যে বাংলাবাজারকে গড়ে উঠতে দেখেছি, সেই বাজারে তত দিনে রাস্তার দুই পাশে শ’ দেড়েক দোকান। কিন্তু রাস্তার দুই পাশের কোনো ভিটিতেই আমাদের ঠাঁই হয়নি। আমাদের দোকান রাস্তার ঠিক মাঝখানে। যখন একা থাকতাম, ভেবে ভেবে কষ্ট পেতাম। কাঁদতামও। সহপাঠীরা বহুবার কান্নার কারণ জানতে চেয়েছে। বলতে পারিনি।

আমার অনীহা ভাব দেখে খালা বললেন, ‘কী রে তোর কী অইছে? যাইবি না দোকানে? আমি কিছু বলি না। খালা আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে আসেন। বাবা আমাদের দেখে হেসে ওঠেন। খালাকে বলেন, কী রে হুক্কি, কী অবস্থা? সুলতান পড়ছেনি? না খালি শয়তানি করছে? খালা বলেন, আন্নে যে কী কন দাদা! আন্নের পোলা অইলো ইবলিশের পোলা। হেতেনি ভালামতোন পড়বো? বান্দরের মতোন সারাক্ষণ লাফালাফি কইরছে। তয় আঁই কিন্তুক খেয়াল রাইখছি সারাক্ষণ। শত অইলেও আঁর তো বইন হুত।’

বাবা বললেন, ‘ভালা কইরছস। তোরা কী খাইবি? বয়।’ খালা দোকানে বসতে রাজি নন। বলেন, ‘দেন। দেন আঙ্গোরে দুই খান করি বেলা বিস্কুট দেন। খাইতে খাইতে চলি যাই।’

আমরা বিস্কুট খেতে খেতে বাড়ির পথ ধরি। হাঁটতে হাঁটতে পথ ফুরাই না। হঠাৎ মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি এলো। তাড়াড়াতি বাড়ি যাওয়ার উপায় পেয়ে গেলাম। খালা বললেন, ‘এক কাজ কর। স্লেটরে সামনে দিকে মার। দেইখবি বাতাসের লগে লগে প্লেনের মতো উইড়বো। আমরা সেই  প্লে ধরতে দৌড় দিমু।’ যেই কথা সেই কাজ। স্লেটের এক কোণা ডান হাতের বৃদ্ধাঙুল, তর্জনি ও মধ্যমার মাঝখানে ধরি। এরপর হাতকে আলতু করে নিচে নামাতে থাকে। মুহূর্ত মাত্র। এরপরই সাঁ করে সামনের ওপরে দিকে ছুড়ে মারি। স্লেট বাতাসে টাল খেতে খেতে রাস্তা থেকে ধানক্ষেতে পড়ে। ধানক্ষেতে তখন খেসারির ডালের নতুন চারা। আর নাড়ায় একাকার।

আমরা সেই ধান ক্ষেতে নেমে পড়ি। খুঁজতে থাকি হারিয়ে যাওয়া স্লেট। স্লেট হারিয়ে যাওয়ার জন্য একজন আরেকজনকে দুষতে থাকি। কিন্তু স্লেট আর পাই না।

খালা রেগে গিয়ে আমাকে বাক্যবাণে জর্জরিত করতে থাকেন। বলেন, ‘তো-তো-তোতলা। খেয়াল রাইখতি হারছ না, কোন দিকে মারছস?’ আমিও রেগে গিয়ে বলি, ‘তু-তু-তু-তুই হারছ না? তু-তু-তু তুই কি কানি নি?’ খালা এবার রাগে-ক্ষোভে দুম করে আমার পিঠে বসিয়ে দেন এক ঘা। আমিও দমার পাত্র নই। তাকে পাল্টা কিল দিতে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত তুলি। অমনি খালা বলেন, ‘মনে আছেনি?’ বলি, ‘কী?’ খালা এবার নরম সুরে বলেন, ‘তোর হাত ভালা ন। যার গায়ে হাত তোলোছ, সে তো বাঁচে না। তুই কি চাস, তোর কিল খাই আইও মরি যাই?’

আমার তখন পালানো দরকার। কোন দিকে পালাবো? উপায়ন্তর না থেকে পুকুর পাড়ের দিকেই রুদ্ধশ্বাসে দিলাম ছুট। 

খালা আমাকে কিল দিয়েছেন, তাতে আমার দুঃখ নেই। মারামারি আমরা প্রায় করি। কিন্তু তোতলা বলে ভ্যাংচি কাটা। কবে আমার চড়ে কার জ্বর হয়েছিল, সে জ্বরে ভুগে কে মারা গেছিল, সেই কথা খালা আজও মনে করিয়ে দিলেন। তার নরম গলার গুষ্ঠি কিলাই। বললাম, ‘এইসব ক-ক-ক-কইলে লাভ নাই। তু-তু-তু-তুই কিল দিছস। অন কিল খা-খা-খা…।’ কথা শেষ করতে দেন না খালা। আবারও আমার তোতলামি নিয়ে বিদ্রূপ করেন। তখন আমার অবস্থা এমন ছিল যে, কেউ আমাকে রাগালে কথা বলতে পারতাম না। হাত-পা ছুড়তাম। চোখ যেন ফেটে বেরিয়ে যাবে, এমন হতো। সেদিনও এর ব্যতিক্রম হলো না। আমি তার দিকে তেড়ে গেলাম। তিনি দৌড়াচ্ছেন। আমাদের বাড়ি পার হয়ে গেলেন। আমি চাইলে  বাড়িতে ঢুকে যেতে পারি। কিন্তু না। খালাকে কিল দিতেই হবে। জিদ চেপে গেছে। তাই তার পেছন পেছন দৌড়াতে থাকি। দৌড়াতে দৌড়াতে খালা পৌছে গেলেন তাদের উঠোনে। পেছন পেছন আমিও। এবার ঘরের সিঁড়িতে হাতজোড় করে দাড়ালেন। মিনতি করে বললেন, ‘তুই আঁর আব্বা। আঁরে কিল দিছ না। তোর হাত ভালা ন।’ খালা যাই বলুক না কেন, আমি তো কিছুই শুনবো না। আমাদের চেঁচামেচিতে নানি বেরিয়ে এলেন। প্রাণপণে আমাকে থামানোর চেষ্টা করছেন। পারছেন না। ঘরের দাওয়ার ঢালুতে ছিল ডালিম গাছ। ডালিম গাছে কাঁচা-কাঁচা প্রচুর ডালিম। সেই ডালিম গাছ তলে তীর-ধনুক রাখা। আগের দিন বিকালে বানিয়ে ছিলাম শালিক মারবো বলে। নাইলনের সুতায় বাঁশের চিকন কঞ্চি বাঁকিয়ে ধনুক বানালাম। আর পাঠখড়ির মাথায় খেজুর-কাঁটা সেঁধে দিয়ে বানালাম তীর। এই তির কোনো শালিকের গায়ে লাগা মাত্রই ধরাশায়ী। রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে পড়তে বাধ্য।

সেই তীর-ধনুক দেখে আমার চোখ চিক-চিক করে উঠলো। মনে মনে বলি, যতই তোর মা তোকে বাঁচাতে চান, আজ আর আমার হাত থেকে রক্ষা নাই। ত্রস্তহাতে তীরধনুক হাতে তুলে নিলাম। দাঁড়ালাম নির্দিষ্ট দূরত্ব রক্ষা করে। আমি উঠোনের মাঝখানে। নানি ও খালা ঘরের সিঁড়িতে। নানি আমাকে থামাতে না পেরে বাঁশে লম্বা কঞ্চি নিয়ে তাড়াতে আসছেন। এবার খালা একা। আমি তীরকে বসালাম ধনুকের ছিলাই। বাম হাতের তর্জনি ও মধ্যমার ফাঁকে আলতো করে ধরলাম তীর-ধনুকের সংযোগ স্থল। ধনুকের নিচের অংশ সুতার ওপর ঠেসে ধরে পেছন দিকে সর্বশক্তি দিয়ে দিলাম টান। নানি প্রায় আমার কাছে এসে গেলেন। আমাকে প্রায় ধরেই ফেলছেন, ঠিক ওই মুহূর্তে ডানহাত থেকে থেকে মুক্তি দিলাম তীর। খালা বিপদ আঁচ করতে পেরে ঘরে ঢুকতে উদ্যোত হলেন। অমনি তার পিঠে বিঁধে গেলো পাঠখড়ির-তীরের মাথায় থাকা খেজুর কাঁটা। ‘মাগ-গো’ বলে এক মর্মভেদী চিৎকারে খালা লুটিয়ে পড়লেন সিঁড়িতে। নানি হতভম্ব। কী করবেন, মুহূর্ত মাত্র। দৌড় দিলেন মেয়ের দিকে। ততক্ষণে মামা-নানাও কাছারি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। আমার তখন পালানো দরকার। কোন দিকে পালাবো? উপায়ন্তর না থেকে পুকুর পাড়ের দিকেই রুদ্ধশ্বাসে দিলাম ছুট।

চলবে…

জীবনের যতিচিহ্নগুলো-১১

মন্তব্য